বিন্দু থেকে সিন্ধু
বিন্দু থেকে সিন্ধু
মডার্ণ কসমোলজিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড মডেল থিওরিমতে, বর্তমান বিজ্ঞান মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব বিষয়ে তথ্য দিতে গিয়ে মানবজাতিকে এ মর্মে অবহিত করেছে যে, প্রায় ১৫০০ কোটি বৎসর পূর্বে কোন এক মহা আলোক শক্তির মহাউৎস হতে হাইয়েস্ট এনার্জেটিক রেডিয়েশন নামে মহাসূক্ষ্ম বিন্দু 10-33cm. আকার ধারণ করে প্রায় ১০,০০০ কোটি কোটি কোটি কোটি ডিগ্রি কেলভীন (K) তাপমাত্রা লাভ করে মাত্র 10-43sec. অর্থাৎ এক সেকেন্ডের ১০ কোটি, কোটি কোটি কোটি কোটি ভাগের মাত্র এক ভাগকাল স্থায়ী সময়ের মধ্যে মহাবিস্ফোরণ Big Bang) এর মাধ্যমে এ মহাবিশ্বের সূচনাকাল শুরু হয়।
Big Bang মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ঐ মতবাদ গবেষণাকারী বিজ্ঞানীগণ Computer simulation'-এর মাধ্যমে ব্যাপক গবেষণা করে সিদ্ধান্ত দেন যে, মূলতঃ highest energetic radiation' তথা কল্পনাতীত শক্তিশালী মহা আলোর গোলক। ‘আলোকশক্তিই প্রথমে ঘনীভূত হয়ে মহা বিন্দুতে প্রবেশ করে এবং পরবতা মুহুতে সেই বিন্দুটি মহাবিস্ফোরণ ঘটিয়ে ক্রমান্বয়ে এ মহাবিশ্বে রূপ নেয়। বিস্ফোরণের পর। মুহূর্তে আলোর কণা ফোটন' (Photon) ছাড়া কোনাে কিছুর অস্তিত্বই ছিলো না ।
মহাবিস্ফোরণ ( বিগ ব্যাং) উত্তর মহাবিশ্বের স্বরূপ
প্ল্যাঙ্কীয় যুগ (প্ল্যাঙ্ক এপক)
মহাবিশ্বের একেবারে শুরুর সময়কালটিকে বলা হয় প্ল্যাঙ্ক এপক বা প্ল্যাঙ্ক যুগ। বিগ ব্যাংয়ের ঠিক পর থেকে এর ব্যাপ্তি মাত্র ১০-৪৩ সেকেন্ড। শূন্যের পর দশমিক দিয়ে ৪৩টি শূন্য দেওয়ার পর ১ লিখলে যে সংখ্যা পাওয়া যায়, সংখ্যাটি তার সমান।
বর্তমান বিজ্ঞান এ সময়ের মহাবিশ্বের খবর ভালো করে বলতে পারে না। আইনস্টাইনের সার্বিক আপেক্ষিকতা বলছে, এ সময়ের আগে একটি মহাকর্ষীয় সিঙ্গুলারিটির অস্তিত্ব ছিল। মনে করা হয়, এ সময়ে প্রকৃতির চারটি মৌলিক বল—মহাকর্ষ, তড়িৎ–চুম্বকত্ব এবং সবল ও দুর্বল নিউক্লীয় বল একীভূত ছিল। এমনকি এদের শক্তিও ছিল একই মাত্রার। যদিও বর্তমানে মহাকর্ষ অন্যদের তুলনায় মাত্রাতিরিক্ত রকম দুর্বল। এটি সবল বলের চেয়ে ১০৩৮ গুণ ও তড়িৎ–চুম্বকীয় বলের চেয়ে ১০৩৬ গুণ দুর্বল। প্ল্যাঙ্ক যুগে মহাবিশ্ব বিস্তৃত ছিল মাত্র ১০-৩৫ মিটার অঞ্চলজুড়ে। এই সংখ্যাটিকে বলা হয় প্ল্যাঙ্ক দৈর্ঘ্য। তবে সাইজ ছোট থাকলে এ সময় তাপমাত্রা ছিল বিশাল। ১০৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের এককের মতোই এরও নাম প্ল্যাঙ্ক তাপমাত্রা। আর হ্যাঁ, এ সময়কালটির নামও প্ল্যাঙ্ক সময়।
মহা একীভবন যুগ
পরের যুগের নাম মহা একীভবন যুগ । ব্যাপ্তি বিগ ব্যাংয়ের পরের ১০-৪৩ থেকে ১০-৩৬ সেকেন্ড। এ সময় মহাকর্ষ অন্য তিনটি মৌলিক বল থেকে আলাদা হয়ে যায়। এ জন্যই এ বল তিনটির একীভূত তত্ত্বকে মহা একীভবন তত্ত্ব বলা হয়।
স্ফীতি যুগ
মহা একীভবন যুগ এর পরপরই শুরু স্ফীতি যুগের। এ যুগেই সামান্য পরিমাণ সময়ের মধ্যে মহাবিশ্ব ১০২৬ গুণ বড় হয়ে যায়। ১ ন্যানোমিটার দৈর্ঘ্যের কোনো বস্তুকে এত বড় করলে সেটা ১০ দশমিক ৬ আলোকবর্ষ পরিমাণ লম্বা হবে। এ হিসাবটি অবশ্য পাওয়া যায় রৈখিক মাপকাঠিতে হিসাব করলে। আয়তনের দিক থেকে হিসাব করলে সাইজ বেড়েছিল ১০৭৮ গুণ অর্থাৎ মাত্র ১০ সেমি। বিগ ব্যাংয়ের ১০-৩২ সেকেন্ড পরই এ যুগের পরিসমাপ্তি ঘটে।
তড়িৎ দুর্বল যুগ
স্ফীতি যুগের সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়েছিল তড়িৎ দুর্বল যুগের যার ব্যাপ্তিকাল ১০-১২ সেকেন্ড পর্যন্ত। এ সময় সবল বল আলাদা হয়ে গেল। একত্রে থাকল শুধু দুর্বল নিউক্লীয় বল এবং তড়িৎ-চুম্বকীয় বল। সৃষ্টি হয় ডব্লিউ, জেড ও হিগস বোসনদের মতো ব্যতিক্রমী কণিকা।
হ্যাড্রোন যুগঃ সুবিন্যস্ত, সুশৃঙ্খল, অভিন্ন প্রাকৃতিক সুষম যুগ
হ্যাড্রোন যুগের এ সময়টিতে মহাবিশ্বে একটা স্থির নিয়ম বলবৎ ছিল। তখন মহাবিশ্বের সামগ্রিক শক্তি ও চার্জ ছিল সংরক্ষিত যার স্থায়িত্ব ছিল ১ সেকেন্ড থেকে মিনিট কয়েক পর্যন্ত। কোয়ার্ক দিয়ে গঠিত যৌগিক কণিকার নাম হ্যাড্রোন। হ্যাড্রোন কণিকাদের মধ্যে আমাদের সবচেয়ে পরিচিত হলো প্রোটন ও নিউউল্লেখ্য, প্রোটন, নিউট্রন ৩টি কোয়ার্ক দিয়ে গঠিত যার একক নাম ব্যারিয়ন আর পায়ন ২টি কোয়ার্ক দিয়ে গঠিত যার একক নাম মেসন। আর ব্যারিয়ন+মেসন মিলে গঠিত হয় হ্যাড্রন কণা পরি হ্যাড্রোন যুগে মহাবিশ্বের তাপমাত্রা আরেকটু কমে এক লাখ কোটি ডিগ্রি হলো। ফলে কোয়ার্করা যুক্ত হয়ে হ্যাড্রোন গঠিত হওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ পেল। পাশাপাশি ইলেকট্রন ও প্রোটনের সংঘর্ষে তৈরি হয় নিউট্রন ও নিউট্রিনো। এই নিউট্রিনো কণারা আজ পর্যন্ত মহাবিশ্বজুড়ে ছুটে চলেছে আলোর কাছাকাছি বেগে।
কোয়ার্ক যুগ
১০-১২ সেকেন্ডের পর শুরু কোয়ার্ক যুগ। এ সময়কালে বিপুল পরিমাণ কোয়ার্ক, ইলেকট্রন ও নিউট্রিনো তৈরি হয়। কোয়ার্ক হলো প্রোটন ও নিউট্রনের গাঠনিক কণা। মহাবিশ্ব আরেকটু ঠান্ডা হলো। নামল ১০ কোয়াড্রিলিয়ন ডিগ্রির (১-এর পর ১৬টি শূন্য বসিয়ে যে সংখ্যা পাবেন) নিচে। তবে সবচেয়ে উল্লেযোগ্য ঘটনা হলো, চারটি মৌলিক বল সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেল। ঠিক বর্তমানে যেভাবে আছে।
লেপটন যুগ
হ্যাড্রোন পরবর্তী যুগের নাম লেপটন যুগ। এ যুগে পূর্ববর্তী অল্প কিছু ছাড়া প্রায় সব হ্যাড্রোন ও প্রতি–হ্যাড্রোন নিঃশেষ হয়ে যায়। ফলে মহাবিশ্বে চলছিল লেপটন ও প্রতি–লেপটনদের (যেমন ইলেকট্রনের প্রতিকণা প্রতি–ইলেকট্রন) রাজ-রাজত্ব। এ দুই বিপরীত চার্জধারী কণার মিলনে অবমুক্ত হয় শক্তি। এ শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটে ফোটনের (আলোর কণিকা) মাধ্যমে। উল্টোভাবে ফোটনরাও আবার মিলিত হয়ে ইলেকট্রন-পজিট্রন জোড় তৈরি করতে থাকে। মহাবিশ্বের প্রথম ৩ মিনিট সময়কালের এখানেই সমাপ্তি ঘটে। এরপর থেকে সময়ের ব্যবধান দাঁড়ায় বিশাল মাপকাঠিতে। এরপর বিশ্ব সংগঠনে প্রকৃতি সময় নেয় অন্ততঃ ১৭ মিনিট যা ছিল অতীব জরুরী এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়-পর্ব। এতে সংঘটিত হয় গুরুত্বপূর্ণ নিউক্লীয় সংশ্লেষণ। এটি হলো নতুন পরমাণুর নিউক্লিয়াস (কেন্দ্র) তৈরির প্রক্রিয়ার নাম। প্রোটন ও নিউট্রন ফিউশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে মিলিত হয়ে তৈরি করে এ নতুন পরমাণু। এভাবেই গড়ে ওঠে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ও লিথিয়ামের মতো পর্যায় সারণির প্রথম দিকের মৌলগুলো। এ অবস্থায় মহাবিশ্বের তাপমাত্রা ছিল প্রায় ১০০ কোটি ডিগ্রি। কিন্তু এ সময়ের পরই তাপমাত্রা ও ঘনত্ব এত বেশি কমে গেল যে, নিউক্লীয় ফিউশনে সাময়িক বিরতি ঘটেছিল। এই ফিউশন পরবর্তী সময়ে আবার শুরু হয়। তবে সেটা সমগ্র মহাবিশ্বে নয়।
ফোটন এপক যুগ
এবারের যুগের নাম ফোটন এপক। তখন মহাবিশ্বে চলছিল বিকিরণের আধিপত্য। পরমাণুর নিউক্লিয়াস ও ইলেকট্রনের উত্তপ্ত স্যুপে গড়া প্লাজমা দিয়ে মহাবিশ্ব তখন ভর্তি। বিকিরণের আধিপত্য থাকার কারণে অধিকাংশ লেপটন ও প্রতি–লেপটন নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। ফলে মহাবিশ্বজুড়ে তখন ছিল ফোটনের ছড়াছড়ি। আর ফোটন মানেই বিকিরণ। আমাদের পারিপার্শ্বিক দৃশ্যমান আলোও একধরনের বিকিরণ। ফোটন যুগের ফোটনরা লেপটন যুগে বেঁচে যাওয়া প্রোটন, ইলেকট্রন ও পরমাণুকেন্দ্রের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতে থাকে। এ যুগের স্থায়িত্ব ৩ মিনিট থেকে ২ লাখ ৪০ হাজার বছর।
কসমোলজিক্যাল রিকম্বিনেশন বা মহাজাগতিক পুনর্গঠন যুগ
এরপর উদ্ভব ঘটে কসমোলজিক্যাল রিকম্বিনেশন বা মহাকাশীয় পুনর্গঠন যুগ। এটি ছিল বিশ্ব জগতে এক ঐতিহাসিক যুগ সন্ধিক্ষণ। এ যুগে হঠাৎ করে তাপমাত্রা সূর্যের পৃষ্ঠ তাপমাত্রার কাছাকাছি ৩০০০ ডিগ্রি নেমে গিয়ে সৃষ্টি হয় রিকম্বিনেশন বা পুনর্গঠন যুগ। এ সময় আয়নিত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম নিউক্লিয়াস ইলেকট্রনের সঙ্গে সন্ধি করে ফেলে। ফলে কেন্দ্রে প্রোটন ও কক্ষপথে ইলেকট্রন নিয়ে পরিপূর্ণ পরমাণু তৈরি হয়ে যায়। এ প্রক্রিয়ারই নাম রিকম্বিনেশন। মহাবিশ্বের প্রায় ৭৫ শতাংশ হাইড্রোজেন ও ২৫ শতাংশ হিলিয়াম—এই অনুপাতটি এ কালের শেষের দিকেই তৈরি হয়।
ডার্ক এরা বা অন্ধকার যুগ
রিকম্বিনেশন যুগের পর থেকে ১৫ কোটি বছর পর্যন্ত সময়কালকে বলে অন্ধকার যুগ (Dark Era) বলা হয়। যুগটি হলো পরমাণু তৈরির পরের ও নক্ষত্রের জন্মের আগের সময়কাল। ফোটনের অস্তিত্ব থাকলেও নক্ষত্রের জন্ম না হওয়ায় এক অর্থে মহাবিশ্ব অন্ধকারই বটে। রহস্যময় ডার্ক ম্যাটারই এ সময় মহাবিশ্বে রাজত্ব করত বলে ধারণা কর
পুনঃ আয়নীকরণ যুগ
এরপর শুরু হলো পুনঃ আয়নীকরণ। মহাকর্ষের আকর্ষণে প্রথম কোয়াসার তৈরি হলো। অন্যদিকে মহাবিশ্ব আবার প্রশম অবস্থা থেকে আয়নিত অবস্থায় চলে গেল। এ যুগটির ব্যাপ্তি বিগ ব্যাং-পরবর্তী ১৫ থেকে ১০০ কোটি বছর।
নক্ষত্র ও গ্যালাক্সির জন্মপ্রক্রিয়া
পুনঃ আয়নীকরণ যুগের পরের ৩০ থেকে ৫০ কোটি বছর ধরে চলল নক্ষত্র ও গ্যালাক্সির জন্মপ্রক্রিয়া, যা পরে চলতেই থাকল। মহাবিশ্ব প্রসারণের পাশাপাশি মহাকর্ষের প্রভাবে বিভিন্ন অঞ্চলের গ্যাস ঘনীভূত হতে হতে জন্ম হয় এসব নক্ষত্র। প্রথম দিকে জন্ম নেওয়া নক্ষত্ররা ছিল বিশাল বড় বড়। সূর্যের প্রায় এক শ গুণ ভারী। এদের আয়ু অবশ্য কম হতো। সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে ঘটত এদের মৃত্যু। একটি ক্ষুদ্র কেন্দ্রীয় অংশ অবশিষ্ট থাকত। বাকি পদার্থ বিস্ফোরণের ধাক্কায় ছিটকে যেত বাইরে- যা ছিল নতুন নক্ষত্র তৈরির উপাদান। নক্ষত্র তৈরির এ চক্রটি কিন্তু আজও চলমান।
চেনা-জানা জগতের জন্ম কথা
আজ থেকে প্রায় ৫০০ কোটি বছর আগেবিগ ব্যাংয়ের ৮৫০ থেকে ৯০০ কোটি বছর পর আমাদের সূর্য নক্ষত্রের ছুড়ে দেওয়া পদার্থ থেকে জন্ম নিয়েছিল। আর পৃথিবীর জন্ম প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে। তীব্র বেগে প্রসারণ ও চক্রাকারে নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মহাবিশ্ব এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে, মহাকালের দিকে। সেই কালের শেষে ঠিক কী আছে, তা ঠিক করে জানা নেই উল্লেখ্য, ১৯১৫ সালে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন তার সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব উপস্থাপনের পর থেকেই মূলত ভৌত বিশ্বতত্ত্ব একটি পর্যবেক্ষণযোগ্য এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালাবিশিষ্ট বিজ্ঞান হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। ফ্রিডম্যান-Lemaître-রবার্টসন-ওয়াকার বিশ্বতত্ত্বের যৌথ ব্যাখ্যামতে, এই মহাবিশ্ব প্রসারিত বা সংকুচিত হতে পারে। (সূত্রঃ উইকিপিডিয়াবিশ্ব জগত আইনগতভাবে কার্যত: দু' ভাগে বিভক্ত। ১) স্থূল জাগতিক আইন ২) সূক্ষ্ণ জাগতিক আইন। ১. স্থূল জাগতিক আইন: স্থূল জাগতিক আইন নিউটনীয় বলবিদ্যার অনেকটা অনুকূল। ২. সূক্ষ্ণ জাগতিক আইন: আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের অনুকূল।
বর্তমান বিশ্বতত্ত্বের মডেল অনুযায়ী মহাবিশ্বের বর্তমান বয়স ১৩.৭৫ বিলিয়ন বা ১,৩৭৫ কোটি বছর। এই মহাবিশ্বের দৃশ্যমান অংশের "এই মুহূর্তের" ব্যাস প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোক বছর। মহাবিশ্বের ব্যাস ১৩.৭৫ x ২ = ২৭.৫০ বিলিয়ন আলোক বছরের চাইতে বেশী। তাছাড়া, পৃথিবীকে কেন্দ্র করে মহাবিশ্বকে যদি একটা গোলক কল্পনা করা হয় তবে তার ব্যাসার্ধ হবে প্রায় ৪৬ বিলিয়ন আলোক বর্ষ। জ্যোতির্বিদরা মনে করছেন দৃশ্যমান মহাবিশ্বে প্রায় ১০০ বিলিয়ন গ্যালাক্সি আছে। এই গ্যালাক্সিরা খুব ছোটও হতে পারে, যেমন মাত্র ১০ মিলিয়ন (বা ১ কোটি) তারা সম্বলিত বামন গ্যালাক্সি অথবা খুব বড়ও হতে পারে, যেমনঃ দৈত্যাকার গ্যালাক্সিগুলিতে ১০০০ বিলিয়ন তারা থাকতে পারে । মহাবিশ্বের গঠন ও আকার আমাদের গ্যালাক্সি-ছায়াপথ সূর্য থেকে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের দূরত্ব প্রায় ৩০,০০০ আলোক বর্ষ। গ্যালাক্সির ব্যাস ১০০,০০০ বা এক লক্ষ আলোক বর্ষ। স্থানীয় গ্যালাক্সিপুঞ্জ আমাদের ছায়াপথের ৫ মিলিয়ন বা ৫০ লক্ষ আলোকবর্ষের মধ্যে অবস্থিত স্থানীয় গ্যালাক্সিগুলো। এই স্থানীয় গ্যালাক্সি দলের মধ্যে বড় তিনটি সর্পিল গ্যালাক্সি - ছায়াপথ, অ্যান্ড্রোমিডা বা M31 এবং M33 একটি মহাকর্ষীয় ত্রিভুজ তৈরি করেছে। অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি আমাদের নিকটবর্তী বড় গ্যালাক্সি। এর দূরত্ব হচ্ছে ২.৫ মিলিয়ন বা ২৫ লক্ষ আলোকবর্ষ। স্থানীয় গ্যালাক্সি মহাপুঞ্জ স্থানীয় গ্যালাক্সি দল থেকে স্থানীয় গ্যালাক্সি মহাপুঞ্জের অন্যান্য দলের দূরত্ত্ব বিদ্যমান। এই মহাপুঞ্জের কেন্দ্র কন্যা গ্যালাক্সি দল হওয়াতে তাকে কন্যা মহাপুঞ্জ বা মহাদল বলা হয়। কন্যা গ্যালাক্সি পুঞ্জ আমাদের থেকে প্রায় ৬৫ মিলিয়ন বা ৬.৫ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এই ধরণের মহাপুঞ্জগুলো ফিতার আকারের মত। সাবানের বুদবুদ দিয়ে এই ধরণের গ্যালাক্সিপুঞ্জ গঠনের মডেল করা যায়। দুটো বুদবুদের দেওয়াল যেখানে মেশে সেখানেই যেন গ্যালাক্সির ফিতা সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের ৫০০ মিলিয়ন বা ৫০ কোটি আলোকবর্ষের মধ্যে অবস্থিত প্রধান গ্যালাক্সিপুঞ্জ ও গ্যালাক্সি দেওয়াল রয়েছে। কন্যা গ্যালাক্সি মহাপুঞ্জসহ ৫০ মেগাপার্সেকের (৫০ মিলিয়ন পার্সেক বা ১৬৩ মিলিয়ন আলোকবর্ষ)মধ্যে সমস্ত পদার্থ ৬৫ মেগাপার্সেক দূরের গ্যালাক্সি পুঞ্জ Abell 3627এর দিকে ৬০০ কিমি/সেকেন্ডে ছুটে যাচ্ছে। মহাবিশ্বের প্রসারণ হচ্ছে বিংশ শতাব্দীর শেষে এসে জ্যোতির্বিদরা আবিষ্কার করলেন মহাবিশ্বের প্রসারণ ত্বরাণ্বিত হচ্ছে।[১১] বিগ ব্যাং(Big Bang) বিংশ শতাব্দীতে বিশ্বতত্ত্বের জগতে প্রচুর গবেষণা হয়েছে আর এর ফলেই গড়ে উঠেছে বৃহৎ বিস্ফোরণ তত্ত্ব যা এখনকার প্রায় সকল বিজ্ঞানীই মহাবিশ্বের সৃষ্টির কারণ হিসেবে মনে করছেন। সাধারণভাবে বলতে গেলে ভৌত বিশ্বতত্ত্ব মহাবিশ্বের অতিবৃহৎ বস্তুসমূহ নিয়ে আলোচনা করে, যেমন: ছায়াপথ, ছায়াপথ শ্রেণী ও স্তবক, ছায়াপথ মহাস্তবক ইত্যাদি। বিশ্বতত্ত্বের নীতিসমূহ কণা পদার্থবিজ্ঞানের জগতে প্রায় অচল। এ যাবৎকালের বিজ্ঞানীদের নিশ্চিত ধারণা-বিশ্বাস ছিল যে, মহাবিশ্ব ৪ প্রধান বলে পরিচালিত। হালে বিজ্ঞানীরা ৫ম যে সত্বার অস্তিত্বের প্রমাণ দাবী করেছেন তার নামকরণ করেছেন এক্স-১৭ নামে। বিজ্ঞানীদের প্রত্যাশা: সম্ভবতঃ স্ট্রিং থিওরীতে পাওয়া যেতে পারে আবিস্কৃত ৫ম বলের যথার্থ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ।
স্থান ও সময় এবং এদের অন্তর্ভুক্ত সকল বিষয় নিয়েই মহাবিশ্ব ।। পৃথিবী এবং অন্যান্য সমস্ত গ্রহ , সূর্য ও অন্যান্য তারা ও নক্ষত্র জ্যোতির্বলয় স্থান ও এদের অন্তর্বর্তীস্থ গুপ্ত পদার্থ , ল্যামডা-সিডিএম নকশা ও শূণ্যস্থান (মহাকাশ) - যেগুলো এখনও তাত্ত্বিকভাবে অভিজ্ঞাত কিন্তু সরাসরি পর্যবেক্ষিত নয়-এমন সবপদার্থ ও শক্তি মিলে যে জগৎ তাকেই বলা হচ্ছে মহাবিশ্ব ।
সূত্র: ১. ফিজিকস অব দ্য ইউনিভার্স ডট কম
২.https://www.bigganchinta.com/physics/early-age-of-universe
বিগ ব্যাংয়ের পর তাৎপর্যপূর্ণ মহাজাগতিক ঘটনাবলীঃ
ফেজ ট্রানজিশন বা মৌলিক পরিবর্তন
বিগ ব্যাংয়ের ১০-১০ সেকেন্ড পর একটি নাটকীয় ঘটনা ঘটে যা মহাবিশ্বের স্থান-কাল এবং অবস্থার পরিবর্তন করে ফেলে। বিজ্ঞানীরা এই ধরণের পরিবর্তনকে বলেন ফেজ ট্রানজিশন বা মৌলিক পরিবর্তন যা কোনো বাহ্যিক পরিবর্তন নয় বরং অভ্যন্তরীণ মৌলিক পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের ফলে সমস্ত স্থান-কাল সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে রূপ ধারণ করে। একেইএখন বলা হচ্ছে হিগস ফিল্ড। যদিও ব্যাপারটি বিজ্ঞানীদের কাছে সম্পুর্ণ অজ্ঞাত, অদৃশ্য। এমনকি তা উপলব্ধি করার মতোও নয়। তবে বিজ্ঞানীরা এই হিগস ফিল্ডের উপস্থিতি বুঝতে না পারলেও ইলেকট্রনের মতো মৌলিক কণিকারা এর প্রভাব ঠিকই বুঝতে পারে। অর্থাৎ অতিক্ষুদ্র মৌলিক কণিকাদের কাছে এই হিগস ফিল্ড একটি বাস্তব জিনিস।আমরা যেমন একটি বায়ু-সমুদ্রের মধ্যে ডুবে আছি, ঠিক তেমনি এই হিগস ফিল্ডও সবসময় আমাদের ঘিরে রেখেছে। তবে তা বাতাসের ন্যায় সর্বত্র নয় বরং মহাবিশ্বব্যাপী সর্বত্র। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে চলে গেলে এই বাতাস আর পাওয়া যাবে না সত্য কিন্তু মহাবিশ্বের এমন কোনো স্থান নেই যেখানে এই হিগস ফিল্ডের উপস্থিতি নেই। অর্থাৎ এটি আমাদের মহাবিশ্বের সমস্ত শূন্যস্থান জুড়েও অবস্থান করছে।
ইলেকট্রনসহ কিছু মৌলিক কণিকার হিগস ফিল্ডে কোয়ান্টাম মেকানিক্যালের মিথস্ত্রিয়া প্রসঙ্গ
ইলেকট্রনের মতো কিছু মৌলিক কণিকা এই হিগস ফিল্ডের সাথে কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল কার্যকলাপে জড়িয়ে আছে। ফলে এসব কণিকারা কিছুটা শক্তি লাভ করে। কোনো একটি কণিকা জন্মের সঙ্গে সঙ্গে এই ফিল্ডের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতে থাকে। এমনকি যদি সেটা স্থির অবস্থায় থাকে, তবুও চলতেই থাকে এই মিথস্ক্রিয়া। ফলে কণিকা জন্মের পরপরই মিথস্ক্রিয়া থেকে কিছুটা শক্তি পায়।
হিগস মেকানিজম
আইনস্টাইনের সেই বিখ্যাত ভর-শক্তি সমীকরণ E=mc থেকে আমরা জানি—ভর আর শক্তি মূলত একই জিনিস। কণিকারা হিগস ফিল্ডের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ফলে শক্তি পায়। হিগস ফিল্ডের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে মৌলিক কণিকাদের ভর পাবার এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় হিগস মেকানিজম।
যেসব কণিকা হিগস ফিল্ডের সঙ্গে কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল কার্যকলাপে জড়ায় না
সব কণিকাই কিন্তু হিগস ফিল্ডের সঙ্গে এই কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল কার্যকলাপে জড়ায় না। যেসব কণিকা হিগস ফিল্ডের সঙ্গে এই মিথস্ক্রিয়ায় অংশ নেয়, তাদের ভর থাকে। অন্যদিকে যারা কোনো মিথস্ক্রিয়ায় জড়ায় না তারা ভরহীন থেকে যায়। কিছু কিছু কণিকা হিগস ফিল্ডের সঙ্গে খুব শক্তিশালী মিথস্ক্রিয়া করে। ফলে এদের ভরও হয় অনেক বেশি। যেমন, টপ কোয়ার্ক। এর ভর এতই বেশি, তা পুরো একটি টাংস্টেন পরমাণুর সমান। আর যেসব কণিকা হিগস ফিল্ডের সঙ্গে খুব সামান্য মিথস্ক্রিয়া করে, তাদের ভর হয় খুবই কম। যেমন ইলেকট্রন, নিউট্রিনো। ইলেকট্রনের ভর এতই কম, কোনো পরমাণুর মোট ভর গণনা করার সময় এর ভর হিসেবে না ধরলেও চলে, নিউট্রিনোর বেলায়ও কথাটি অনেকাংশে প্রযোজ্য। আবার ফোটন হিগস ফিল্ডের সঙ্গে কোন মিথস্কফলে ফোটন ভরহীন থেকে যায়।
হিগস ফিল্ডের কোয়ান্টাকে বলা হয় হিগস বোসন
কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি অনুসারে, কোনো কোয়ান্টাম ফিল্ডকে প্রচণ্ড শক্তিতে আঘাত করা হলে সেই ফিল্ডে এক ধরনের কম্পন তৈরি হবে। এই কম্পনে সেই ফিল্ডের কোয়ান্টা তৈরি হয়। এই কোয়ান্টাগুলোকেই আমরা কণিকা হিসেবে পর্যবেক্ষণ করি। অর্থাৎ আমরা যেসব মৌলিক কণিকার কথা বলি, এগুলো মূলত বিভিন্ন কোয়ান্টাম ফিল্ডের কম্পন। ইলেকট্রনের ফিল্ডকে আঘাত করা হলে ইলেকট্রন তৈরি হবে। কোয়ার্ক ফিল্ডে আঘাত করলে কোয়ার্ক তৈরি হবে। ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডে আঘাত করলে আলোর কণিকা ফোটন তৈরি হবে। হিগস ফিল্ড যেহেতু একটি কোয়ান্টায়ান্টাম ফিল্ড, তাই হিগস ফিল্ডকে আঘাত করলেও একটি কণিকা তৈরি হবে। হিগস ফিল্ডের কোয়ান্টামকে বলি হিগস বোসন।
উল্লেখ্য, হিগস বোসন মৌলিক কণিকাদের ভর প্রদান করে না, বরং এই কাজটি করে হিগস ফিল্ড। হিগস বোসনের নিজেরও ভর রয়েছে। সেটাও আসে এই হিগস ফিল্ড থেকে।
হিগস ফিল্ড মৌলিক কণিকাদের কেবল ভরের জোগান দেয়।লক্ষ্যনীয় যে, হিগস ফিল্ড মৌলিক কণিকাদের কেবল ভরের জোগান দেয়। পদার্থের সকল ভর হিগস ফিল্ড থেকে আসে না।
সাধারণ পদার্থ গঠিত হয় ইলেকট্রন, প্রোটন আর নিউট্রনে
ইলেকট্রনের ভর আসে হিগস ফিল্ড থেকে
ইলেকট্রন একটি মৌলিক কণিকা, তাই একটি ইলেকট্রনের সকল ভরই হিগস ফিল্ড থেকে আসে।
প্রোটনের ভর আসে দ্বৈতসূত্রে
়প্রোটন মৌলিক কণিকা নয়। দুইটি আপ কোয়ার্ক আর একটি ডাউন কোয়ার্ক মিলে একটি প্রোটন তৈরি করে। আপ কোয়ার্কের ভর ২.৩ MeV (মেগা ইলেকট্রন ভোল্ট) আর ডাউন কোয়ার্কের ভর ৪.৮ MeV। সে হিসেবে আপ-ডাউনের একক ভর হচ্ছে (২.৩+২.৩+৪.৮) = ৯.৪ MeV –এই ভর আসে হিগস ফিল্ড থেকে। । কিন্তু একটি প্রোটনের প্রকৃত ভর ৯৩৮.২৮ MeV। তাহলে প্রোটনের বাকি ভর যে সূত্রে আসে তা হচ্ছে সবল নিউক্লীয় বলক্ষেত্রের কণিকা গ্লুয়ন । বিদ্যুৎচুম্বক বলক্ষেত্র যেমন, পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রন ও প্রোটনকে ধরে রাখে, তেমনি সবল নিউক্লীয় বল দুইটি আপ কোয়ার্ক ও একটি ডাউন কোয়ার্ককে একত্রে বেঁধে রেখে প্রোটন তৈরি করে। এই বেঁধে রাখার কাজটি করে সবল নিউক্লীয় বলের কণিকা গ্লুয়ন। প্রোটনের বাকি ভরটুকু আসে এই ভরহীন গ্লুয়নের গতিশক্তি থেকে। দেখা যাচ্ছে, একটি প্রোটনেশতাংশেরও কম ভর আসে হিগস ফিল্ড থেকে।
অবশেষে হিগস বোসন কণার সন্ধান লাভ
কণাপদার্থবিজ্ঞানীরা ২০১২ সালের ৪ জুলাই, বুধবার লার্জ হ্যাড্রন কোলায়ডারে (এলএইচসিতে) ১২৫.৩ GeV ভর ও ০ স্পিনের একটি কণিকা আবিষ্কার করেন। পদার্থবিজ্ঞানীরা মনে করছেন—স্ট্যান্ডার্ড মডেলের ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে যে হিগস বোসন কণিকার অস্তিত্ব থাকার কথা, এটিই সেই হিগস বোসন কণা। হিগস ফিল্ডের এক ধরনের (কোয়ান্টাম) উত্তেজনার কারণে হিগস বোসন তৈরি হয়। ফলে হিগস বোসন আবিস্কারের মধ্য দিয়ে হিগস ফিল্ডের অস্তিত্ব নিয়ে আমরা অনেকটা নিশ্চিত হতে পেরেছি।
বিজ্ঞানীরা যা এখনও নিশ্চিত নন
হিগস বোসন কণা আবিস্কারের মধ্য দিয়ে হিগস ফিল্ডের অস্তিত্ব নিয়ে বিজ্ঞানীরা অনেকটা নিশ্চিত হতে পারলেও এখনো কিন্তু অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি। কোনো কণিকা কেন হিগস ফিল্ডের সাথে শক্তিশালী মিথস্ক্রিয়া করবে, আবার কিছু কণিকা কেন খুব সামান্য মিথস্ক্রিয়া করবে, সে সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা তেমন কিছুই জানি না। এমনকি ডার্ক ম্যাটার ও নিউট্রিনোর ভর হিগস ফিল্ড থেকে আসে কিনা, তা নিয়েও বিজ্ঞানীরা শতভাগ নিশ্চিতএছাড়া কিছু জটিল সমস্যাও রয়েছে। ইলেকট্রন, কোয়ার্ক, ফোটন, গ্লুয়ন ইত্যাদি যেসব কণিকার সঙ্গে আমরা পরিচিত—এ ধরনের প্রতিটি মৌলিক কণিকাকে স্ট্যান্ডার্ড মডেল একদম নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। স্ট্যান্ডার্ড মডেলের এই কাঠামো গড়ে উঠেছে প্রকৃতির কিছু প্রতিসাম্যতার উপর ভিত্তি করে। এসব প্রতিসাম্যতার উপর ভিত্তি করে পদার্থবিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম বলক্ষেত্রের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য গাণিতিকভাবে প্রতিপাদন করতে পারেন! কিন্তু আমরা যে হিগস ফিল্ডের কথা জানলাম, তা কোন প্রতিসাম্যতার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। অর্থাৎ হিগস ফিল্ড বলে একটি ফিল্ড আসলে কেন আছে তা সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। বিষয়টি কিছুটা এমন যে—এটি আছে তাই আছে, কিন্তু কেন আছে তা আমরা জানি না। এটি পদার্থবিজ্ঞানীদের কাছে অনেক বড় একটি সমস্যা। স্ট্যান্ডার্ড মডেল আমাদের চেনাজানা দুনিয়াকে খুব নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করতে পারলেও অনেকগুলো, ‘কেন?’ এর উত্তর দিতে পারে না। এই কেনগুলোর মধ্যে একটি বড় সমস্যা হলো হিগস ফিল্ডের মতো একটি ফিল্ডের উপস্থিতি। ফলে হিগস ফিল্ডের মাধ্যমে মৌলিক কণিকাদের ভর প্রাপ্তির বর্তমান ব্যাখ্যা আসলে একটি অসম্পুর্ণ ও অসন্তোষজনক সমাধান৮। বেশিরভাগ পদার্থবিজ্ঞানীই মনে করেন যে—শুধু হিগস বোসনেই মহাবিশ্বতত্ত্বের গল্পের শেষ হতে পারে না।
বস্তু/পদার্থ এলো কি করে?
বৈজ্ঞানিক গবেষণামতে, মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং পরবর্তী সদ্য সৃষ্ট মহাবিশ্ব যখন একটু শীতল হলো, তখন সেখানে সৃষ্টি হয় অদৃশ্য এক ধরণের বল -যাকে বলা হয় হিগস ফিল্ড (Higgs Field)|হিগস ফিল্ডে তৈরী হয় অসংখ্য ক্ষুদে কণা। এই হিগস ফিল্ড দিয়ে ছুটে যাওয়া সব কণা হিগস-বোসনের সংস্পর্শে এসে ভরপ্রাপ্ত হয়। ভরপ্রাপ্ত এই কণা-কে বলা হয় বস্তু বা পদার্থ (Matter)।
হিগস বোসন কণা কী ?
A subatomic particle called the Higgs Boson Particle or “God’s particle”.
অর্থঃ অতি পারমানবিক কণাকে হিগস-বোসন কণা বলা হয়।বিগ ব্যাং বা মহাবিষ্ফোরণ পরবর্তী অবস্থায় কি কি সৃষ্টি হতে পারে তা আলবার্ট আইনেস্টাইন দিব্যি উপলদ্ধি করতেন। এ উপলদ্ধিতেই নিহিত ছিল আজকের সাড়া জাগানো “হিগস বোসন” নামক আবিস্কৃত অতিপারমানবিক কণাটি।
অষ্টম শতাব্দীর আরব বিজ্ঞানী জাবির ইবনে হাইয়ানপ্রত্যেক বস্তুই মূলে পৌঁছে (ফারাবী আল আরাবী)।
আধুনিক ইউরোপে আসার আগে অ্যারিস্টটলের ধারণায় অনেক বেশি পরিবর্তন না এলেও নতুন একটা অংশ যুক্ত হয়। ধারণাটি প্রবর্তন করেন অষ্টম শতাব্দীর আরব বিজ্ঞানী জাবির ইবনে হাইয়ান। তাঁর দেওয়া মূলনীতি ছিল দুটি। একটাকে ডাকা হতো ১. মার্কারি বা পারদ নামে, আরেকটা ২. সালফার। এই মার্কারি বা সালফার ঠিক আমাদের চেনা পারদ-সালফার নয়। মার্কারি প্রিন্সিপলটা হলো ‘ঠান্ডা’ ও ‘ভেজা’। অন্যদিকে সালফার হলো ‘গরম’ ও ‘শুকনো’। ইংরেজিতে cool-moist ও hot-dry। এই চারটা ধর্ম চার মৌলিক পদার্থের মাঝামাঝি নতুন একটা অবস্থানের নির্দেশ করে। এই সালফার-মার্কারি থিওরি অনুযায়ী এই চারটা ধর্মই তৈরি করে মূল সাতটা ধাতু—স্বর্ণ, রৌপ্য, তামা, টিন, লোহা, সিসা ও পারদ। সালফার-মার্কারি থিওরির চার কোয়ালিটি নির্ধারণ করে দেয় কোন ধাতু কেমন হবে। যেমন লোহার গলনাঙ্ক অনেক বেশি, ঘষা খেলে স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি হয়, তাই এতে নিশ্চয় সালফার অংশ অর্থাৎ গরম-শুকনা অ্যারিস্টটলের চার মৌল এবং জাবির ইবনে হাইয়ানের সালফার-মার্কারি—এ মিলেই তৈরি হয় বহুল প্রচলিত তালিকা। একটা বর্গাকৃতির চার কোণে চারটি মৌলিক পদার্থের এই তালিকাকেই বলা যায় প্রথম পর্যায় সারএই ধারণায় নতুনত্ব যোগ করেন ষষ্ঠদশ শতকে সুইস চিকিৎসা বিজ্ঞানী প্যারাসেলসাস। তিনি মার্কারি-সালফার থিওরিতে ‘সল্ট’ বা লবণ যোগ করে আরেকটু বিস্তৃত তত্ত্ব বানান। সালফার-মার্কারি-সল্টের এই তত্ত্ব অনুসারে জাবিরের মতো শুধু ধাতুই নয়, অন্য সব পদার্থও তৈরি হয় এসব ধর্ম দিয়েই।
Comments
Post a Comment