মহাবিশ্বের তথ্য জানতে কম্পিউটার সিমুলেশনের ভুমিকা
মহাবিশ্বের তথ্য জানতে কম্পিউটার সিমুলেশনের ভুমিকা
কম্পিউটারের মাধ্যমে মহাকাশ গবেষণার শুরুটা হয়েছিল গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে। মার্কিন কম্পিউটেশনাল পদার্থবিদ জন পাস্তা আর স্তানিলাউ উলাম এনরিকো ফার্মির সঙ্গে মিলে কম্পিউটার সিমুলেশন পদ্ধতি ব্যবহার শুরু করেন। তারা একটি মহাকর্ষীয় সিস্টেম প্রথমবারের মতো মাউস-মনিটর বিহীন কম্পিউটারের মাধ্যমে গণনা করে সীমিত আকারে প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করেন। এতে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় কম্পিউটারের ব্যবহারের দ্বার খুলে গিয়েছিল। মহাকাশ গবেষণায় ব্যাপকহারে কম্পিউটারের ব্যবহার শুরু হয় ১৯৭০-এর দশকে। নাসার মাধ্যমে। তখন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পিউটারটি ছিল নাসার গবেষণাগারেই।
নাসায় দুই সহোদর গবেষক অ্যালান টুমরে এবং ইউরি টুমরে দুটি গ্যালাক্সির মধ্যে সংঘর্ষের ব্যাপারটি তাঁরা পর্যবেক্ষণ করতে চান কম্পিউটারের সাহায্যে পর্যবেক্ষণ করে গ্যালাক্সি দুটিকে দুটি ভরপিণ্ড হিসেবে দেখিয়ে তার সাংঘর্ষিক ফলাফল কী হতে পারে তার একটা হিসাব কম্পিউটার থেকে বের করার করলেন। সেই ঘটনাটিই মহাজাগতিক কোনো ঘটনায় কম্পিউটার ব্যবহারের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। দুটি আলাদা হিসাব বের করেছিলেন। একটা হিসাব তাঁরা করেছিলেন টেলিস্কোপের সাহায্যে। দুটি গ্যালাক্সি পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে কী কী ঘটনা ঘটে তা টেলিস্কোপের সাহায্যে দেখে নোট রেখেছিলেন। তাছাড়া গ্যালাক্সি দুটির ভর, গতি-প্রকৃতি ইত্যাদি তথ্য কম্পিউটারে ইনপুট করে সে দুটো সংঘর্ষ ঘটলে কী হবে তার একটা হিসাব কষেছিলেন কম্পিউটারের সাহায্যে। তাঁরা অবাক হয়ে লক্ষ করেন, বাস্তব পর্যবেক্ষণ থেকে যেসব ফলাফল তারা পেয়েছেন, সেই একই ফলাফল পেয়েছেন কম্পিউটার সিমুলেশন থেকেও। এভাবে কম্পিউটার সিমুলেশনের ব্যাপারটা মহাজাগতিক গবেষণায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে।
টুমরে ভাইদের সেই যুগন্তকারী কম্পিউটার গণনায় আজকের জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যায় নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। তাদের দেখানো পথে হেঁটেই বিজ্ঞানীরা মিলেনিয়াম সিমুলেশনের অনুপ্রেরণা পান।
মিলেনিয়াম সিমুলেশন করা হয় ২০০৫ সালে। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, কানাডা আর জাপানের একদল গবেষক মিলে গোটা মহাবিশ্বের একটা তুলনামূলক চিত্র তৈরি করতে এই সিমুলেশনটা করেন।
উল্লেখ্য, মহাবিস্ফোরণের তিন লাখ ৮০ হাজার বছর পর মহাবিশ্ব থেকে প্রথম ফোটন অর্থাৎ আলোকরশ্মিমুক্ত হয়। অর্থাৎ প্রথম আলোর জন্ম হয়। সেই আলো বা বিকিরণই আবিষ্কার করেন অর্নো আর পেনজিয়াস। সেটাই কসমিক মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন।
এই কণাগুলোকে একটা নির্দিষ্ট নিয়মে সাজানো হয়। তারপর সিমুলেশনের নিয়মানুযায়ী মহাবিশ্বের একটা মডেল তৈরি করা হয় সেই কণাগুলো দিয়ে। তারপর প্রসারণশীল মহাবিশ্ব যে নিয়মে প্রসারিত হয়, সেই নিয়মটা বেঁধে দেওয়া হয় সিমুলেশন মডেলে। মহাবিশ্বের বক্রতা আর মহাজাগতিক ধ্রুবকের মানও ইনপুট করা হয় সেই সিস্টেমে। সঙ্গে দেওয়া হয় ডার্ক ম্যাটার আর ডার্ক এনার্জিও। তার তার পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় না। এলোমেলোভাবে ডার্ক ম্যাটার আর ডার্ক এনার্জির বিভিন্ন মান দেওয়া হয়। সত্যি বলতে কী, ডার্ক ম্যাটার আর ডার্ক এনার্জির পরিমাণ বের করে নিয়ে আসাই ছিল সেই সিমুলেশনের মূল উদ্দেশ্য। এরপর শুরু হয় ক্যালকুলেশন।
যে সুপার কম্পিউটারটি একাজে ব্যাবহার করা হয় তার প্রায় আট শ প্রসেসর আর দুই টেরাবাইট মেমরি এই ক্যালকুলেশনে অংশ নেয়। প্রতি সেকেন্ডে প্রায় চার মিলিয়ন ডাটা প্রসেস করে সেগুলো। তারপর বেরোয় ফলাফল। সেই ফলাফল বলে মহাবিশ্বের জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং বর্তমান অবস্থা আসলে ল্যামডা সিডিএম মডেল অনুসরণ করে চলছে। এই মডেল বলে, মহাবিশ্বের মাত্র চার শতাংশ দৃশ্যমান বস্তুকণা দিয়ে গড়ে উঠেছে। বাকি ৯৬ শতাংশের ২১ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার। আর বাকি ৭৫ শতাংশই ডার্ক এনার্জি।
আরও উল্লেখ্য, ভেরা রুবিন মহাবিশ্বের যে মডেলের কথা বলেছিলেন, সেখানে দৃশ্যমান বস্তু আর ডার্ক ম্যাটারের যে পরিমাণের কথা বলেছিলেন, কম্পিউটার সিমুলেশন থেকেও সেই একই মান পাওয়া যাচ্ছে।
জাবের ইবনে হাইয়ানের ঠান্ডা-গরম তত্ত্ব
ল্যামডা সিডিএম অর্থাৎ ল্যামডা কোল্ড ডার্ক ম্যাটারের মানে কি ডার্ক ম্যাটারের সঙ্গে ঠাণ্ডা-গরমের কোনো সম্পর্ক আছে। সত্যি বলতে কী, হট ‘ডার্ক ম্যাটার বলে একটা শব্দ প্রচলিত আছে জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানে। ডার্ক ম্যাটারকে অতি ঘন এক রহস্যময় গুপ্ত পদার্থ বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। সেগুলো একসঙ্গে স্তূপের মতো গতিহীন বস্তুপিণ্ড বলে মনে করেন ডার্ক ম্যাটার গবেষকরা। এগুলো হলো কোল্ড ডার্ক ম্যাটার। আরেক ধরনের ডার্ক ম্যাটার আছে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। সেগুলো অত্যন্ত গতিশীল। যেমন নিউট্রিনো। তাহলে কি নিউট্রিনো আসলেই ডার্ক ম্যাটার?
সূত্র : সায়েন্টিফিক আমেরিকান
Comments
Post a Comment